বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট: স্বদেশি আন্দোলন ও বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশ:

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট: স্বদেশি আন্দোলন ও বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশ:

ভূমিকা:

ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাংলায় শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছিল। এই ব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত এবং তা ছিল বিদেশি নিয়ন্ত্রণাধীন। এরই প্রতিবাদে এবং স্বনির্ভর জাতি গঠনের লক্ষ্যে স্বদেশি আন্দোলনের সময় বাংলায় জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হয়। এই প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হল বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠা:

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পর বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন জোরদার হয়। এই আন্দোলনের প্রভাবে জাতীয় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভূত হয়। বিশিষ্ট আইনজীবী ও শিক্ষা-দরদি তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৫ জুলাই ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে এই প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য:

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—

  • ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা
  • বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো
  • দেশীয় শিল্প ও প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা
  • বাংলার শিক্ষিত যুবসমাজকে স্বনির্ভর ও আত্মনির্ভর করে তোলা

এই প্রতিষ্ঠান ছিল স্বদেশি আন্দোলনের শিক্ষাক্ষেত্রের একটি বাস্তব রূপ।

জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক:

স্বদেশি আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে যে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে, বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল। দেশীয় চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

সমন্বয় ও রূপান্তর:

দেশীয় শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে
বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এবং বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ একত্রিত হয়ে
👉 ‘বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ অ্যান্ড টেকনিক্যাল স্কুল’ নাম গ্রহণ করে।
পরবর্তীতে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়
👉 কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (CET)

পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাব্যবস্থা:

এই প্রতিষ্ঠানে কলাবিভাগের পাশাপাশি

  • পদার্থবিদ্যা
  • রসায়ন
  • প্রযুক্তি
  • শিল্পপ্রযুক্তি

প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে বাংলার বহু শিক্ষিত যুবক আধুনিক কারিগরি জ্ঞান অর্জন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় এবং স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।

জার্নাল প্রকাশ:

কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি-র ছাত্রছাত্রীরা ‘টেক’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করত। এই জার্নালের প্রথম সংখ্যা উৎসর্গ করা হয় স্বদেশি আন্দোলনের সেই সব আত্মত্যাগীদের উদ্দেশ্যে, যাঁরা জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

উপসংহার:

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট বাংলায় কারিগরি ও জাতীয় শিক্ষার বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিষ্ঠানই পরবর্তীকালে রূপান্তরিত হয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়, যা আজ ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাই বলা যায়, বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট ছিল স্বদেশি আন্দোলনের শিক্ষাক্ষেত্রের এক ঐতিহাসিক সাফল্য।

GKnotebook.in সাধারণ জ্ঞান ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একটি তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েবসাইট। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এম.এ এবং শিক্ষকতা করি। এখানে শিক্ষার্থীরা GK, Current Affairs, এবং পরীক্ষামুখী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত নোটস পেয়ে থাকে।

Post Comment

error: Content is protected !!