চুয়াড় বিদ্রোহ: কারণ ও ফলাফল: Chuar Rebellion.

ভূমিকা:

আঠারো শতকের শেষভাগে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। বাংলায় নবাবি শাসন বিলোপের পর কোম্পানি কঠোর রাজস্বনীতি গ্রহণ করে, যার ফলে কৃষক, আদিবাসী ও নিম্নবর্গের মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলার জঙ্গলমহল অঞ্চল—বর্তমান মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় বসবাসকারী আদিবাসী চুয়াড় বা জঙ্গলবাসী গোষ্ঠী—ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাকে বলা হয় চুয়াড় বিদ্রোহ। এটি 1767 থেকে 1809 পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা একাধিক দফার সংগ্রাম, যা বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী প্রথম আদিবাসী আন্দোলনগুলির মধ্যে অন্যতম।

চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ:

ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থার অত্যাচার:

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্বনীতি ছিল বিদ্রোহের প্রধান কারণ। প্লাসির যুদ্ধের পর কোম্পানি বাংলার রাজস্ব সংগ্রহের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তারা রাজস্ব বৃদ্ধি করে এবং কঠোরভাবে আদায় করতে থাকে। বহু চুয়াড় পরিবারকে স্বল্প উত্পাদন সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কর দিতে হতো। কর দিতে ব্যর্থ হলে জমি বাজেয়াপ্ত করা হত। ফলে চুয়াড়দের অর্থনৈতিক সংকট গভীরতর হয় এবং বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

বন-জঙ্গল ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিষেধাজ্ঞা:

চুয়াড়রা প্রধানত বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল ছিল—শিকার, জ্বালানি কাঠ, বনফল, পশুপালন ইত্যাদিই ছিল তাদের জীবিকার মূল উপাদান। ব্রিটিশরা বনাঞ্চলের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তাদের এই ঐতিহ্যগত অধিকার কেড়ে নেয়। ফলে যা ছিল তাদের বংশপরম্পরায় চলে আসা অধিকার, তা হঠাৎই বেআইনি হয়ে দাঁড়ায়। এই অবিচার তাদের ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

নতুন জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ:

ব্রিটিশরা নিলামে জমি বিক্রি করে নতুন জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি করে। এরা প্রায়ই অত্যাচারী, লোভী এবং সহিংস পন্থায় খাজনা আদায় করত। চুয়াড়দের কাছ থেকে অসম্ভব খাজনা দাবি এবং তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত। ফলে চুয়াড়দের মধ্যে বিদ্রোহ প্রবণতা আরও তীব্র হয়।

ঐতিহ্যগত স্বশাসন ব্যবস্থার বিলোপ:

চুয়াড়দের নিজস্ব পদ্ধতির সামাজিক ও প্রশাসনিক শাসন ছিল, যাকে ইংরেজরা স্বীকার করেনি। নিজস্ব রাজা, মুকুন্দ বা মাথা এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ইংরেজদের আধিপত্য কেড়ে নেয়। স্বশাসনের অধিকার হারিয়ে তারা ইংরেজদের বিরোধিতা শুরু করে।

দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও অনাহার পরিস্থিতি:

আঠারো শতকের শেষদিকে এই অঞ্চলে কয়েক দফা খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানি ত্রাণ বা সাহায্যের ব্যবস্থা না করে উল্টে কর আদায়ে কঠোরতা বজায় রাখে। দুর্ভিক্ষে মৃত মানুষের পাশে থেকেও রাজস্ব আদায়কারীরা কর চেয়ে বসত, যা চুয়াড়দের বিদ্রোহী করে তোলে।

স্থানীয় নেতাদের অপমান ও বঞ্চনা:

রাজা তিলকচাঁদ, লুকাস সিং, রঘুনাথ সিংহ, দুর্গাবতী সিংহ প্রমুখ স্থানীয় প্রধানদের ইংরেজরা অপমান করে এবং কখনও তাঁদের উপঢৌকন ও পদ থেকে বঞ্চিত রাখে। এই অপমান-অবিচার তাঁদেরকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে বাধ্য করে।

চুয়াড় বিদ্রোহের ফলাফল:

ব্রিটিশ দমননীতি ও ব্যাপক হত্যালীলা:

কোম্পানি বাহিনী অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বিদ্রোহ দমন করে। বহু চুয়াড়কে হত্যা করা হয়, অনেক গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, হাজার হাজার মানুষ বন পাহাড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। চুয়াড় সমাজ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

চুয়াড় রেগুলেশন (1805) প্রবর্তন:

ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে অতিরিক্ত শোষণ বিদ্রোহ বাড়াচ্ছে। ফলে 1805 সালে ‘চুয়াড় রেগুলেশন’ নামের বিশেষ আইন আনা হয়। এই আইনে কিছু পরিমাণ করছাড়, বন ব্যবহারের সীমিত অধিকার এবং স্বশাসনের কিছু সুযোগ পুনরায় দেওয়া হয়।

জঙ্গলমহলের প্রশাসনিক পুনর্গঠন:

ব্রিটিশরা জঙ্গলমহলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনিক সংস্কার আনে। গ্রামপ্রধানদের কিছু ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে কিছুটা নমনীয় করে।

ভবিষ্যৎ আদিবাসী বিদ্রোহের অনুপ্রেরণা:

চুয়াড় বিদ্রোহ সাঁওতাল বিদ্রোহ (1855), হো বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ, উলগুলান (বিরসা মুন্ডা আন্দোলন) ইত্যাদি পরবর্তী আদিবাসী আন্দোলনের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। চুয়াড়দের সংগ্রাম ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আদিবাসী অসন্তোষকে সংগঠিত করে।

ব্রিটিশ শাসনের দুর্বলতা প্রকাশ:

এই বিদ্রোহ দেখিয়ে দেয় ব্রিটিশ শাসনমূলত শোষণের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই বিদ্রোহের পর কোম্পানি রাজস্ব ও বন আইন নিয়ে পুনর্বিবেচনার পথে এগোয়।

উপসংহার:

চুয়াড় বিদ্রোহ ছিল বাংলার জঙ্গলমহলে ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক আদিবাসী প্রতিরোধ। অর্থনৈতিক শোষণ, বনজ সম্পদের অধিকার হরণ, করনীতি এবং সামাজিক অপমানের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন বহু বছর ধরে চলেছিল। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা দমন করলেও এটি ভারতীয় প্রতিরোধ ইতিহাসে এক অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে। এই বিদ্রোহ শুধু ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ করেনি, বরং পরবর্তী বহু আদিবাসী ও কৃষক বিদ্রোহের ভিত্তি স্থাপন করেছে।

Sukanta Das

GKnotebook.in সাধারণ জ্ঞান ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একটি তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েবসাইট। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এম.এ এবং শিক্ষকতা করি। এখানে শিক্ষার্থীরা GK, Current Affairs, এবং পরীক্ষামুখী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত নোটস পেয়ে থাকে।

Related Posts

দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতভুক্ত করার ক্ষেত্রে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা: Sardar-patel-indian-states-integration.

ভূমিকা: ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশীয় রাজ্যগুলোকে স্বাধীন ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা। দেশ স্বাধীন হলেও সেই সময় ভারতের ভূখণ্ড অনেকখানি ভাগে বিভক্ত ছিল—প্রায় ৫০০টি প্রদেশ ও…

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’: Upendrakishore Ray Chowdhury and ‘U. N. Ray and Sons’.

ভূমিকা: উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্য ও প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি কেবল একজন সাহিত্যিকই নন, ছিলেন একজন দূরদর্শী প্রযুক্তিবিদ ও মুদ্রণশিল্পের পথিকৃৎ। তাঁর হাত ধরেই বাংলায় আধুনিক ছাপাখানা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You Missed

দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতভুক্ত করার ক্ষেত্রে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা: Sardar-patel-indian-states-integration.

দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতভুক্ত করার ক্ষেত্রে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকা: Sardar-patel-indian-states-integration.

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’: Upendrakishore Ray Chowdhury and ‘U. N. Ray and Sons’.

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও ‘ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স’: Upendrakishore Ray Chowdhury and ‘U. N. Ray and Sons’.

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট: স্বদেশি আন্দোলন ও বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশ:

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট: স্বদেশি আন্দোলন ও বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশ:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা: rabindranath-tagore-colonial-education-system.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা: rabindranath-tagore-colonial-education-system.

নেহরু–লিয়াকৎ চুক্তি (১৯৫০): উদ্বাস্তু সমস্যা, শর্ত ও ফলাফল (nehru-liaquat-pact-1950-refugee-problem).

নেহরু–লিয়াকৎ চুক্তি (১৯৫০): উদ্বাস্তু সমস্যা, শর্ত ও ফলাফল (nehru-liaquat-pact-1950-refugee-problem).

ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি (১৯২৮): গঠন, উদ্দেশ্য ও কার্যকলাপ (Workers and Peasants Party).

ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি (১৯২৮): গঠন, উদ্দেশ্য ও কার্যকলাপ (Workers and Peasants Party).

বিরসা মুন্ডা ও মুন্ডা বিদ্রোহ: Munda rebellion.

বিরসা মুন্ডা ও মুন্ডা বিদ্রোহ: Munda rebellion.

চুয়াড় বিদ্রোহ: কারণ ও ফলাফল: Chuar Rebellion.

চুয়াড় বিদ্রোহ: কারণ ও ফলাফল: Chuar Rebellion.

ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলন: উৎস, বিস্তার ও গুরুত্ব: The Wahhabi movement in India.

ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলন: উৎস, বিস্তার ও গুরুত্ব: The Wahhabi movement in India.

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল: The Santal Rebellion.

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল: The Santal Rebellion.

সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল: sannyasi-fakir-rebellion-in-bengal.

সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল: sannyasi-fakir-rebellion-in-bengal.

ভারতের সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কয়েকটি ধারা (সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস): Indian society, economy and culture (Class 7 History)

ভারতের সমাজ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কয়েকটি ধারা (সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস): Indian society, economy and culture (Class 7 History)

নেহরু–লিয়াকৎ চুক্তি (১৯৫০): পটভূমি, বিষয়বস্তু ও ফলাফল: nehru-liyaqat-pact-1950-analysis-bangla.

নেহরু–লিয়াকৎ চুক্তি (১৯৫০): পটভূমি, বিষয়বস্তু ও ফলাফল: nehru-liyaqat-pact-1950-analysis-bangla.

ওয়াহাবী আন্দোলন: কারণ, বিকাশ ও ফলাফল (Wahhabi movement)

ওয়াহাবী আন্দোলন: কারণ, বিকাশ ও ফলাফল (Wahhabi movement)

ভারতের সশস্ত্র-বিপ্লবী আন্দোলন: (Armed revolutionary movement in India).

ভারতের সশস্ত্র-বিপ্লবী আন্দোলন: (Armed revolutionary movement in India).
error: Content is protected !!