বিরসা মুন্ডা ও মুন্ডা বিদ্রোহ: Munda rebellion.

বিরসা মুন্ডা ও মুন্ডা বিদ্রোহ: Munda rebellion.

ভূমিকা:

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিভিন্ন আদিবাসী আন্দোলন বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশ শাসনের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে আদিবাসী সমাজ বহুবার অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৮৯৯–১৯০০ সালের মুন্ডা বিদ্রোহ, যা ‘উলগুলান’ বা ‘মহা-বিপ্লব’ নামে পরিচিত, বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন বিরসা মুন্ডা, যিনি শুধু একজন উপজাতীয় তরুণ নেতা নন, বরং ধর্মীয় সংস্কারক, সমাজসংগঠক এবং প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে মুন্ডারা ব্রিটিশ শাসন ও বহিরাগত শোষণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম পরিচালনা করে।

বিরসা মুন্ডার জীবন ও নেতৃত্ব:

বিরসা মুন্ডার জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৮৭৫ সালে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের উলিহাটি অঞ্চলে। দরিদ্র মুন্ডা পরিবারে জন্ম নেওয়া বিরসা শৈশব থেকেই ব্রিটিশ শাসনের দমননীতি, দিকু (বহিরাগত হিন্দু-মুসলিম জমিদার-মহাজন) শোষণ এবং মিশনারিদের সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই তিনি সমাজের সমস্যাগুলি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেন।

পরে তিনি নিজেকে ঈশ্বরের দূত এবং নতুন ধর্মের প্রচারক বলে দাবি করেন। তিনি ‘বিরসাইট’ নামে একটি ধর্মীয়-সামাজিক দল তৈরি করেন, যার লক্ষ্য ছিল সমাজ সংস্কার, মদ্যপান বর্জন, প্রথাগত শোষণ নির্মূল ও সাংস্কৃতিক ঐক্য পুনরুদ্ধার করা। ক্রমে তিনি ঘোষণা করেন যে মুন্ডাদের হারানো রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই তাঁর লক্ষ্য, এবং ব্রিটিশ শাসন শেষ হয়ে আসছে।

মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ:

ব্রিটিশ ভূমি নীতির শোষণ:

ব্রিটিশরা ‘জমিদারি’ ও ‘নথবন্দি’ প্রথা চালু করে উপজাতিদের পৈতৃক ভূমি থেকে উৎখাত করে। মুন্ডাদের ‘খুন্তখাতি’ প্রথা, অর্থাৎ পূর্বপুরুষের জমির অধিকার সম্পূর্ণরূপে ক্ষুণ্ণ হয়।

জমিদার-মহাজনদের অত্যাচার:

বহিরাগত হিন্দু-মুসলিম জমিদার ও মহাজনরা জোরপূর্বক খাজনা আদায় এবং জমি দখল করত। মুন্ডাদের উপর বাধ্যতামূলক শ্রম চাপিয়ে দেওয়া হতো।

মিশনারিদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন:

খ্রিস্টান মিশনারিরা আদিবাসীদের ঐতিহ্যকে নিম্ন দেখাত এবং ধর্মান্তরিত হবার চাপ সৃষ্টি করত। তাদের এই হস্তক্ষেপ আদিবাসী সমাজে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

দারিদ্র্য, খাজনার বোঝা ও সামাজিক সংকট:

অত্যধিক খাজনা, চরম দারিদ্র্য, বারবার দুর্ভিক্ষ এবং পুলিশি অত্যাচার মুন্ডাদের বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করে।

বিরসার নেতৃত্ব ও ‘মুন্ডা রাজ’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান:

বিরসার ক্রান্তিকারী আহ্বান ও ধর্মীয় নেতৃত্ব আদিবাসীদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে প্রজ্জ্বলিত করে।

মুন্ডা বিদ্রোহের বিস্তার ও ঘটনাপ্রবাহ:

১৮৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহের বিস্ফোরণ ঘটে। মুন্ডারা সাদা পতাকা বহন করত, যা ‘বিরসা রাজ’-এর প্রতীক ছিল। বিরসার অনুসারীরা প্রথমে পুলিশের থানা, গির্জা, মিশনারি বিদ্যালয় ও মহাজনদের বাড়ি আক্রমণ করে। প্রতিটি আক্রমণের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক ও শোষকেরা।

২৪ ডিসেম্বর ১৮৯৯ থেকে জানুয়ারি ১৯০০ পর্যন্ত রাঁচি, তামাড়, খুন্তি, গুমলা অঞ্চলে ব্যাপক আকারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

  • ৬ জানুয়ারি ১৯০০ — মুন্ডারা জেলা প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
  • ৭ জানুয়ারি — এক কনস্টেবল নিহত হয়।
  • ব্রিটিশরা প্রতিআক্রমণে ‘বিট অ্যান্ড সার্চ’ অভিযান শুরু করে।

অবশেষে ৩ মার্চ ১৯০০ ইং ব্রিটিশ পুলিশ জামকোপাই জঙ্গলে এক রাত্রিকালীন অভিযানে বিরসাকে গ্রেপ্তার করে। ৯ জুন ১৯০০ তিনি রাঁচি কারাগারে রহস্যজনকভাবে মারা যান। ব্রিটিশরা কলেরাকে মৃত্যুর কারণ বলে উল্লেখ করলেও তা সন্দেহজনক বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

মুন্ডা বিদ্রোহের ফলাফল ও প্রভাব:

১. ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন (CNTA), ১৯০৮— উপজাতিদের ভূমির অধিকার রক্ষায় এটি এক যুগান্তকারী আইন।
২. জোরপূর্বক শ্রম (বেথ বেগার) নিষিদ্ধ করা হয়।
৩. খুন্তি ও গুমলা অঞ্চলকে পৃথক মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
৪. ব্রিটিশ প্রশাসন এ অঞ্চলে শাসন পদ্ধতি পরিবর্তনে বাধ্য হয়।
৫. আদিবাসী সমাজে আত্মপরিচয়ের নবজাগরণ ঘটে।
৬. বিরসা মুন্ডা আজও ঝাড়খণ্ডের নায়ক; ১৫ নভেম্বর তাঁর জন্মদিনে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করা হয়।

উপসংহার:

বিরসা মুন্ডার মুন্ডা বিদ্রোহ শুধু একটি উপজাতীয় বিদ্রোহ ছিল না; এটি ছিল সামাজিক ন্যায়, ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মর্যাদার সংগ্রাম। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনকে থামিয়ে দিলেও তাঁর আদর্শ ও আত্মত্যাগ আদিবাসী সমাজে স্বাধীনতার চেতনা সঞ্জীবিত রাখে। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিস্তৃত ধারায় বিরসা মুন্ডা এক অমর বীর, যিনি শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে আজও পূজিত।

GKnotebook.in সাধারণ জ্ঞান ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একটি তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েবসাইট। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এম.এ এবং শিক্ষকতা করি। এখানে শিক্ষার্থীরা GK, Current Affairs, এবং পরীক্ষামুখী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত নোটস পেয়ে থাকে।

Post Comment

error: Content is protected !!