রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিতে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা: rabindranath-tagore-colonial-education-system.
ভূমিকা:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, “শিক্ষা হল বাইরের প্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন”। তিনি শিক্ষাকে কেবল তথ্য বা ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং মানবমনের স্বাধীন বিকাশ ও সৃজনশীলতার পথ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর সময়ে ভারতে প্রচলিত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা রবীন্দ্রনাথের এই শিক্ষাদর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। ফলে তিনি এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন।
যান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা:
রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক স্কুল ছিল একটি কারখানার মতো, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে পাঠদান শুরু ও শেষ হতো। শিক্ষক ছিলেন সেই কারখানার যন্ত্রাংশমাত্র। তাঁর ভাষায়— “ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি, সে একটা শিক্ষা দিবার কল।” এতে শিক্ষার মানবিক দিক সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
নীরস ও প্রাণহীন পাঠ্যক্রম:
চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ পাঠদান রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল নীরস ও একঘেয়ে। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষায় পাশ করা ও ডিগ্রি অর্জন, জ্ঞানার্জন নয়।
শিক্ষার সুযোগ সীমিত:
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, এই শিক্ষাব্যবস্থা কেবল শহুরে মুষ্টিমেয় শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য ছিল। গ্রামবাংলার বিপুল জনগোষ্ঠী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থেকেছে। ফলে শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
চিন্তার স্বাধীনতা ও মানসিক বিকাশের অন্তরায়:
শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর বিচারক্ষমতা, চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বিকশিত হওয়া উচিত—এটাই ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস। কিন্তু ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা ছাত্রদের কেবল অনুকরণপ্রবণ করে তুলেছিল। এই ব্যবস্থার সমালোচনা করেই তিনি রচনা করেন বিখ্যাত ‘তোতাকাহিনি’, যেখানে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবহেলা:
রবীন্দ্র রচনাবলীর ‘শিক্ষার সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ইংরেজি বিদ্যালয়গুলি ভারতের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজের দেশ ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যেই শিক্ষার ফল:
১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেন, বিদেশি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা সাধারণ মানুষের পক্ষে আত্মস্থ করা কঠিন। এর ফলে শিক্ষার সুফল সীমাবদ্ধ থাকে অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যেই।
উপসংহার:
এই সমস্ত সীমাবদ্ধতার কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার কথা ভাবেন। শিশুর স্বাধীনতা, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ ও আত্মবিকাশের লক্ষ্যে তিনি শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শিক্ষাদর্শন আজও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ।



Post Comment