ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলন: উৎস, বিস্তার ও গুরুত্ব: The Wahhabi movement in India.

ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলন: উৎস, বিস্তার ও গুরুত্ব: The Wahhabi movement in India.

ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষে মুসলমান সমাজ নানা কারণে আর্থিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়তে থাকে। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক কাঠামো ও বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে বহু মুসলমান তাদের প্রচলিত জীবিকা হারায়। ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি ভাষার প্রবর্তন এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রতি মুসলমান সমাজের অনীহা তাদের আরও পিছিয়ে দেয়। এই সংকটজনক সময়ে ইসলাম ধর্মকে মধ্যযুগীয় বিশুদ্ধ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আরব থেকে আগত একটি নতুন ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব ভারতে পড়তে শুরু করে। সেই আন্দোলনই ইতিহাসে ওয়াহাবী আন্দোলন নামে পরিচিত।

ওয়াহাবী আন্দোলনের মূল আদর্শ

ওয়াহাবী আন্দোলনের প্রবক্তা ছিলেন আরবের আবদুল ওয়াহাব। তাঁর মতে, ইসলাম ধর্মকে কোরআন ও হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী সরল, বিশুদ্ধ এবং মৌলিক রূপে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুসলমান সমাজে যে সমস্ত প্রথা, অনুষ্ঠান বা আচরণ ইসলাম-বিরোধী বা ‘বেদাত’ হিসেবে বিবেচিত হয়, সেগুলো বর্জনই ছিল এই আন্দোলনের লক্ষ্য।
আবদুল ওয়াহাব মৃতের দরগাপূজা, ধূপদীপ ব্যবহার, রেশমী পোশাক পরা, অলঙ্কার পরিধান ও ধূমপানের বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, এগুলো ইসলাম ধর্মের প্রকৃত চেতনার বিরোধী।

ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলনের সূচনা: সৈয়দ আহম্মদের ভূমিকা

রায়বেরিলির সৈয়দ আহম্মদ ভারতে ওয়াহাবী মতবাদের মূল প্রচারক হিসেবে পরিচিত। তিনি উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষত উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও বাংলায় এই ধর্মীয় আন্দোলনের বিস্তার ঘটান। কলকাতা ও পাটনায় তাঁর অসংখ্য অনুসারী গড়ে ওঠে।
মক্কায় গিয়ে তিনি মূল ওয়াহাবী মতবাদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন এবং ফিরে এসে পাটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন জোরদার করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামকে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জাগ্রত করা।

ধর্মীয় আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তর

প্রথমে ওয়াহাবী আন্দোলন ছিল ইসলাম ধর্মের সংস্কারমূলক আন্দোলন। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে।
ওয়াহাবীদের মতে, ইংরেজ শাসনে ভারত ‘দার-উল-হারব’ বা শত্রুর দেশ। তাই মুসলমানদের কর্তব্য হলো ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে দেশকে ‘দার-উল-ইসলাম’-এ পরিণত করা।
ফলে এই আন্দোলন সরাসরি ব্রিটিশ-বিরোধী রূপ নেয় এবং বিভিন্ন স্থানে সামরিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। আন্দোলনের অনেক অনুসারী ঈশ্বরনন্দন, শিখ শাসকদের বিরুদ্ধেও অস্ত্রধারণ করেন, বিশেষত পাঞ্জাবে।

শিখবিরোধী সংগ্রাম ও সৈয়দ আহম্মদের মৃত্যু

সৈয়দ আহম্মদ মনে করতেন, পাঞ্জাবের শিখ শাসন মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তাই তিনি পাঠান অধ্যুষিত অঞ্চলে শিখদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন।
অল্প সময়ের জন্য তিনি পেশোয়ার দখল করতেও সক্ষম হন। কিন্তু ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বালাকোটের যুদ্ধে শিখ সেনাপতি শের সিং-এর হাতে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। যদিও তাঁর মৃত্যুতে আন্দোলন থেমে যায়নি।

আলি ভ্রাতৃদ্বয় ও আন্দোলনের বিস্তার

সৈয়দ আহম্মদের পর তাঁর দুই প্রধান শিষ্য উলায়েত আলিএনায়েত আলি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
তাঁরা বাংলা, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি ও হায়দরাবাদে ওয়াহাবী আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার ঘটান।
হায়দরাবাদের নিজামের সমর্থন পাওয়ায় দক্ষিণ ভারতেও আন্দোলন বলিষ্ঠ হয়।

বাংলায় নাসিরুদ্দিন এবং কাশিম খাঁর মতো নেতারা ইংরেজ ও শিখদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালান।

ওয়াহাবী আন্দোলন ও তিতুমীরের সম্পর্ক

বাংলার বিখ্যাত নেতা তিতুমীরের বাশের কেল্লার আন্দোলন কখনও কখনও ওয়াহাবী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
তিতুমীর ইসলাম ধর্মের সংস্কার সাধন থেকে আন্দোলন শুরু করে পরবর্তীতে জমিদার-নীলকর ও শেষে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
যদিও এটি সম্পূর্ণভাবে ওয়াহাবী আন্দোলন ছিল কি না, সে বিষয়ে ইতিহাসে বিতর্ক আছে।

ওয়াহাবী আন্দোলনের পরিসমাপ্তি

১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পরও আন্দোলন টিকে থাকলেও ব্রিটিশদের কঠোর দমননীতির ফলে এর শক্তি দ্রুত কমতে থাকে।
মিটানা ঘাঁটি দখল, নেতাদের গ্রেফতার এবং রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দের পর আন্দোলন কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

উপসংহার

ভারতে ওয়াহাবী আন্দোলন মূলত ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা রাজনৈতিক ও সামরিক রূপ ধারণ করে। মুসলমান সমাজে আত্মপরিচয়, ঐক্য ও ধর্মীয় জাগরণ সৃষ্টি হলেও সংগঠনের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ব্রিটিশ সামরিক শক্তির কারণে আন্দোলন সফল হতে পারেনি। তবুও এটি ভারতীয় মুসলমান সমাজের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

GKnotebook.in সাধারণ জ্ঞান ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একটি তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েবসাইট। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এম.এ এবং শিক্ষকতা করি। এখানে শিক্ষার্থীরা GK, Current Affairs, এবং পরীক্ষামুখী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত নোটস পেয়ে থাকে।

Post Comment

error: Content is protected !!