ভূমিকা:
অসহযোগ আন্দোলনের (১৯২০–২২ খ্রি.) অবসানের পর ভারতের জাতীয় আন্দোলনে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যায়। বিশেষত শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। এই সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট নেতারা উপলব্ধি করেন যে, শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত না করা গেলে জাতীয় আন্দোলনকে গণভিত্তিক করা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক ও কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি’ (Workers and Peasants Party বা WPP) গঠিত হয়। এই দলটি ভারতের শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির গঠন:
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির উৎপত্তি হঠাৎ করে নয়, বরং একাধিক রাজনৈতিক সংগঠনের ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। প্রথমে শ্রমিক ও কৃষকদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে ‘দি লেবার স্বরাজ পার্টি অব দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এই দলের নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘পেজেন্টস্ অ্যান্ড ওয়ার্কার্স পার্টি’ হয়। এই সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন মুজাফফর আহমেদ, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, এস. এ. ডাঙ্গে, কুতুবউদ্দিন আহমেদ এবং হেমন্ত কুমার সরকার প্রমুখ বামপন্থী ও কমিউনিস্ট চিন্তাবিদরা।
অবশেষে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে দলটির নাম পুনরায় পরিবর্তিত হয়ে ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি’ আত্মপ্রকাশ করে। কলকাতা ছিল এই সংগঠনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পরে কলকাতার আদলে পাঞ্জাব, বোম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের সংগঠন গড়ে ওঠে।
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির উদ্দেশ্য:
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিক ও কৃষকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এই দলের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল—
- শ্রমিকদের কাজের সময়সীমা নির্ধারণ এবং শ্রমিকদের মানবিক কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা।
- বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অর্জন।
- সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে শাসকশ্রেণির অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সম্ভব হয়।
- জমিদারি প্রথার বিলোপসাধন করে কৃষকদের শোষণমুক্ত করা।
- সর্বনিম্ন মজুরি আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা।
এই উদ্দেশ্যগুলির মধ্য দিয়ে WPP মূলত ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষকদের সংগঠিত করতে চেয়েছিল।
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির কার্যকলাপ:
নিজেদের লক্ষ্য পূরণের জন্য ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচি গ্রহণ করে। শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই সংগঠন উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং শ্রমিক স্বার্থের প্রশ্নটি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
জাতীয় কংগ্রেসও এই সংগঠনের অনেক আন্দোলনের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহানুভূতি প্রকাশ করেছিল। তবে কৃষকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির সাফল্য তুলনামূলকভাবে কম ছিল। গ্রামীণ সমাজে সংগঠনের দুর্বলতা ও প্রশাসনিক দমননীতির ফলে কৃষক আন্দোলন জোরদার করা সম্ভব হয়নি।
মূল্যায়ন:
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকতে না পারলেও ভারতের শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনে এর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সংগঠন শ্রমিক ও কৃষকদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং ভবিষ্যতে কমিউনিস্ট ও কৃষক আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি ছিল ভারতের জাতীয় আন্দোলনে শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। যদিও এটি কৃষক আন্দোলনে বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তবুও শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনে এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ভারতের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে এই দলের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি (১৯২৮): MCQ
১. অসহযোগ আন্দোলনের পর কোন সময় পর্যন্ত শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে?
ক) ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ
খ) ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ
গ) ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ
ঘ) ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ
২. শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে কোন দল গঠিত হয়?
ক) ফরোয়ার্ড ব্লক
খ) কিষান সভা
গ) ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি
ঘ) স্বরাজ পার্টি
৩. ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়—
ক) ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে
খ) ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে
ঘ) ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে
৪. ‘দি লেবার স্বরাজ পার্টি অব দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ পরে কোন নামে পরিচিত হয়?
ক) কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি
খ) পেজেন্টস্ অ্যান্ড ওয়ার্কার্স পার্টি
গ) কমিউনিস্ট পার্টি
ঘ) হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টি
৫. নিচের কোন ব্যক্তি ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
ক) মহাত্মা গান্ধী
খ) জওহরলাল নেহরু
গ) কবি নজরুল ইসলাম
ঘ) সুভাষচন্দ্র বসু
৬. নিচের কোনজন WPP–এর নেতাদের মধ্যে ছিলেন না?
ক) মুজাফফর আহমেদ
খ) এস. এ. ডাঙ্গে
গ) হেমন্ত কুমার সরকার
ঘ) রাজেন্দ্র প্রসাদ
৭. ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টির অন্যতম উদ্দেশ্য কোনটি?
ক) পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী
খ) জমিদারি প্রথার বিলোপসাধন
গ) স্বদেশি শিল্প রক্ষা
ঘ) সাম্প্রদায়িক সমাধান
৮. WPP কোন অধিকার অর্জনের দাবি জানায়?
ক) ধর্মীয় স্বাধীনতা
খ) বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা
গ) ভোটাধিকার
ঘ) নারী অধিকার
৯. সর্বনিম্ন মজুরি আইন প্রবর্তনের দাবি করেছিল—
ক) স্বরাজ পার্টি
খ) ফরোয়ার্ড ব্লক
গ) ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি
ঘ) হোম রুল লীগ
১০. জাতীয় কংগ্রেস WPP–এর আন্দোলনের প্রতি কী মনোভাব দেখিয়েছিল?
ক) সম্পূর্ণ বিরোধিতা
খ) নিরপেক্ষতা
গ) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহানুভূতি
ঘ) কঠোর দমননীতি
১১. কলকাতার ধাঁচে কোন কোন অঞ্চলে এই ধরনের সংগঠন গড়ে ওঠে?
ক) মাদ্রাজ ও কেরল
খ) পাঞ্জাব ও বোম্বাই
গ) বিহার ও উড়িষ্যা
ঘ) আসাম ও ত্রিপুরা
১২. WPP কোন ক্ষেত্রে বেশি সাফল্য লাভ করেছিল?
ক) কৃষক সংগঠনে
খ) ছাত্র আন্দোলনে
গ) ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে
ঘ) নারী আন্দোলনে
১৩. কৃষকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে WPP–এর সাফল্য কেমন ছিল?
ক) অত্যন্ত সফল
খ) মাঝারি
গ) ক্ষীণ
ঘ) সম্পূর্ণ ব্যর্থ
পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ:
- WPP = ১৯২৮ খ্রি.
- নেতৃত্বে নজরুল ইসলাম, মুজাফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে
- ট্রেড ইউনিয়নে সাফল্য, কৃষক আন্দোলনে দুর্বলতা





